কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা

মানস সরোবর ও গুরুলা মান্ধাতা পর্বত

মানস সরোবর ও গুরুলা মান্ধাতা পর্বত

২৯ শে মে, ২০১২ ৷ আমি ও সহকর্মী শেখর রাতের বিমানে নাগপুর থেকে দিল্লী পৌছালাম ৷ পরের দিন ভোরবেলা বিমানে দিল্লী থেকে কাঠমান্ডু ৷ উদ্দেশ্য কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা ৷ নেপালে এখন বেশ কয়েকটি বেসরকারি পর্যটন সংস্থা আছে, যাদের ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর কয়েক হাজার মানুষ এই যাত্রা করে থাকে ৷ যাত্রীরা নেপাল থেকে দক্ষিণপূর্ব তিব্বতে প্রবেশ করে ৷ ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানেও প্রতিবছর কয়েকশ যাত্রী কুমায়ুন হিমালয়ের মধ্যে দিয়ে দক্ষিণপশ্চিম তিব্বতে প্রবেশ করে ৷ কৈলাস ও মানস সরোবর পশ্চিম তিব্বতে অবস্থিত ৷ নেপাল হয়ে গেলে প্রায় অর্ধেক সময়ে এই যাত্রা করা যায় বলে, আমরা চলেছি নেপালের এক পর্যটন সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ৷

সেই পর্যটন সংস্থার দু’জন কর্মচারী, কাঠমান্ডু বিমান বন্দর থেকে আমাদের হোটেলে নিয়ে গেল ৷ সারাদিন বিশ্রাম নিলাম ৷ সন্ধেবেলায় সংস্থার ম্যানেজার আমাদের এই যাত্রা সম্পর্কে বহু তথ্য দিলেন ৷ যেমন চিনের কোনো সরকারি ভবন ও সেনাবাহিনীর শিবিরের ছবি তোলা নিষেধ, ১২ জন শেরপা সহ আমরা মোট ৯০ জন এই যাত্রায় যাবো ৷ সংস্থার দেওয়া ব্যাগে নিজেদের জামাকাপড়, অল্প খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ ইত্যাদি গুছিয়ে নিয়ে, রাতেই সেই ব্যাগ শেরপাদের দিয়ে দিতে হল ৷

পরের দিন সকালবেলা আমরা বাসে করে কোডারী সীমান্তে পৌছালাম ৷ ভোটে কোশী নদীর উপরে বন্ধুত্বের সেতু ৷ এপারে নেপালের কোডারী, ওপারে চিনের ঝাঙ মু ৷ সীমান্তের কিছুটা আগে, কোশী নদীতে রাফটিং আর বাঞ্জি জাম্পিং এর সুব্যবস্হা আছে ৷ সীমান্তে যাত্রীদের ভিড় দেখে মনে হলো কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা এখন খুব সহজ হয়ে গেছে ৷ প্রায় ৬০০ জন যাত্রী, সবকটি পর্যটন সংস্থার মিলিয়ে ৷ আগামী ৪ই জুন, সোমবার, বর্ষা শুরু হওয়ার আগে শেষ পূর্ণিমা তিথি ৷ জগন্নাথদেবের এই স্নানপূর্ণিমা তিথিতে ভগবান ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ মানস সরোবরে স্নান করেন ৷ আর সেই তিথিতেই যাত্রীরা মানস সরোবরে পূর্ণস্নান করতে পারবে বলে ভিড়টা অনেক বেশি ৷

নেপাল ও চিনের সরকারি দপ্তরে দলের ভিসা আর প্রত্যেকের পাসপোর্ট পরীক্ষা করানোর পর, আমরা পা রাখলাম চিনের মাটিতে ৷ অনেকেই ঘড়ির কাঁটা চিনের সময় অনুয়ায়ী করে নিলাম ৷ চিনের সময় ভারতীয় সময় থেকে দু’ঘন্টা কুড়ি মিনিট এগিয়ে ৷ ঝাঙ মু অনেকটা সিমলার মতো ৷ তিব্বতের শুরু এখান থেকেই ৷ পাহাড়ী এলাকা, অল্প ঠান্ডা আছে ৷ চিনে চাউমিন খাবার পর এক হোটেলে রাত কাটালাম ৷

১লা জুন ৷ সকালে ভলবো বাসে এসে পৌছালাম নায়ালাম শহরে ৷ যাত্রাপথে আরও এগোলে ঠান্ডা কি রকম বাড়বে তার আগাম সঙ্কেত এখানেই পাওয়া যায় ৷ শুনেই এসেছি, কৈলাসের কাছাকাছি তাপমাত্রা -৭ ডিগ্রী থাকবে ৷ নায়ালামে পুরো একদিন থাকব, যাতে শরীর আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে পারে ৷ আমি, শেখর আর আদ্যাপীঠের এক ব্রহ্মচারী ভরত ভাই একটা পাহাড়ে উঠে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিলাম ৷ বিশ্রাম নিলাম শিসা পাঙমা হোটেলের ঘরে ৷

পরের দিন ৷ নায়ালাম থেকে জঙবা বা ডোঙবার উদ্দেশ্যে বেরোলাম ৷ রাস্তা খুবই ভাল ৷ ১ ঘন্টা পরে পৌছে গেলাম লালুং লা (লা মানে গিরিপথ) পাসে ৷ গাড়ি থেকে নেমে প্রায় প্রত্যেকে ছবি তুললাম শিসা পাঙমা শৃঙ্গের ৷ আর কিছুটা এগিয়ে আমরা জাতীয় সড়ক ছেড়ে পশ্চিমে প্রাদেশিক সড়কে ঢুকে পড়ি ৷ জাতীয় সড়ক চলে গেছে লাসার দিকে, আর প্রাদেশিক সড়ক মানস সরোবরের দিকে ৷ রাস্তা কখনও সমতল, আবার কখনও পাহাড়ের গা ঘেসা ৷ পরিবেশ রুক্ষ প্রকৃতির ৷ লাদাখের সাথে অনেকটা মিল আছে ৷ মালভূমিতে কোথাও কোথাও অল্প বরফ পড়ে আছে ৷ খুব অল্প ঘাসও চোখে পড়ে ৷ বাতাসে অক্সিজেন কম বলে বড় গাছপালা নেই ৷ গড় উচ্চতা ১৪০০০ ফুট ৷

পথে এল পেখু সো (সো মানে হ্রদ) ৷ নীল রঙের এই হ্রদের শোভা অতুলনীয় ৷ বাসের মধ্যে সকলের ছবি তোলার ব্যস্ততা ৷ আসলে বাসের বাইরে নামলেই, ঠান্ডা হাওয়ার প্রকোপ সামলাতে হচ্ছে ৷ পেখু হ্রদের পরে চড়াই উতরাই বাড়তে থাকে ৷ হঠাৎ এক পাহাড় থেকে বাস নীচে নামতেই দেখতে পেলাম ব্রহ্মপুত্র নদ ৷ পুরান মতে, মানস সরোবরের সৃষ্টিকর্তা ভগবান ব্রহ্মা ৷ আর এই সরোবরের থেকে উৎপত্তি বলেই নদের নাম ব্রহ্মপুত্র ৷ নদের ধারেই আমাদের মধ্যাহ্নভোজনের আয়োজন ৷ বিভিন্ন আকৃতির আর বিভিন্ন রঙের পাথর পড়ে আছে এই নদের ধারে ৷ বাস উঠে চার ঘন্টার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পর এল ডোঙবা শহর ৷ বিশ্রাম নিলাম অতিথিশালায় ৷

৩রা জুন, বহু আকাঙ্খিত দিন ৷ তাই সকলের মুখে হাসি ৷ আজ দুপুরে মানস সরোবর পৌছাবো ৷ ডোঙবা থেকে ছয় ঘন্টার পথ ৷ পুরোটাই পাকা রাস্তা ৷ গতকাল ১৬০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ছিল ৷ প্রকৃতির রুপ অবশ্য গতকালের মতনই ৷ চোখে পড়ে হরিণের দল ৷ তিব্বতীরা মেষ আর ইয়াকের দল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ৷ দুপুর তিনটে নাগাত মানস সরোবর পৌছালাম ৷ জায়গার নাম হরচু ৷ প্রত্যেকের মন আনন্দে উল্লসিত ৷ কেউ কেউ সরোবরের দিকে প্রাণভরে চেয়ে থাকতে থাকতে কেঁদেও ফেলল ৷ আসলে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা নিয়ে অনেকেরই মনে দীর্ঘদিনের আশা, ভক্তি, সবকিছু ৷ কেউ প্রণাম করছে, কেউ জল নিয়ে মাথায় দিচ্ছে, আর কেউবা ছবি তুলতে ব্যস্ত ৷

১৫০৬০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই সরোবরের পরিধি প্রায় ৮৮ কিলোমিটার, ক্ষেত্র ৩২০ বর্গ কিলোমিটার এবং কোথাও কোথাও গভীরতা ৩০০ ফুট ৷ সরোবরের তিব্বতী নাম মাফাম ইউ সো ৷ উত্তরে কৈলাস আর দক্ষিণে গুরুলা মান্ধাতা পর্বত ৷ হরচু থেকে ভালভাবেই দেখা যায় এই দুই পর্বতকে ৷ সরোবরের জলে তিনটি রঙ প্রায় সবসময়ই দেখা যায় ৷ সামনে ধূসর, মাঝে সবুজ আার দূরে নীল ৷ কখনও কখনও সূর্যের আলোর নির্ভর করে ভিন্ন রঙের বর্ণালী তৈরী হয় মানসের জলে ৷ সেই রুপ সত্যিই মনমুগ্ধকর ৷ সূর্যাস্ত দেখে আমরা সরোবরের পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্তে যাই ৷ উদ্দেশ্য অতিথিশালা ৷ সেখানেই আমরা দু’রাত কাটাবো ৷

আজই বিকালে পূর্ণিমা লেগেছে ৷ চাঁদের আলো চারিদিকে ৷ শুনেছি, চিনের সময় অনুযায়ী রাত দুটো থেকে চারটের মধ্যে দেবতা আর দেবদূতেরা মানস সরোবরে স্নান করতে আসেন ৷ সেই সময় আলোর ভিন্ন প্রকারের খেলা চলে মানসের আকাশে ৷ আমরা ১৪ জন পরিকল্পনা করে মধ্যরাতে সরোবরের পাড়ে যাই ৷ প্রথমে দেখলাম, দু’একটা তারা আকাশ থেকে মানসের জলে নেমে আসছে ৷ ঘটনাটা আরও দু’বার ঘটতে দেখলাম ৷ হয়ত চোখের ভ্রমও হতে পারে ৷ কিন্তু তারপর আকাশে বিভিন্ন আকারের আলোর ঝলকানি শুরু হল ৷ এই দিব্যসুন্দর আলো দেবদূতের কি না তা জানি না ৷ তবে প্রায় ৬০ বার সেই রকম আলোর ঝলক দেখতে পেলাম ৷ এক ঘন্টা পরে অতিথিশালায় ফেরত গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম ৷

সকালে উঠে আমি আর ব্রহ্মচারীজী সরোবরের ধারে ঘুরতে গেলাম ৷ ভেট দ্বারকার মতো এখানেও আছে সাদা রঙের ওয়াডেলস পাখি, রয়েছে খয়েরী ও কালো রঙের হাঁসেদের ঝাক ৷ আজ অর্থাৎ ৪ই জুন বিকাল পর্যন্ত পূর্ণিমা ৷ একটা ল্যান্ড ক্রইজার গাড়ি ভাড়া নিয়ে আমরা পাঁচজন বেরিয়ে পড়লাম মানস সরোবর পরিক্রমা করতে ৷ আরেকটা উদ্দেশ্য, সরোবরের যেদিকে অল্প পাথর আছে, সেদিকে গিয়ে স্নান করা ৷

গাড়িতে মিষ্টি তিব্বতী গান চলছে ৷ হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দিই ৷ দেখতে পেয়েছি সোনালি রঙের সেই পাখি, যার অনেক গল্প শুনেছি ৷ এরা সবসময় জোড়াতে থাকে ৷ একের মৃত্যু হলে অন্যজনও উপবাস করে খুব তাড়াতাড়ি মারা যায় ৷ অনেকে এদের শিব পার্বতীর প্রতিরুপ বলেও মনে করে ৷ ছবি তুলে গাড়িতে উঠে একটু যেতে না যেতেই দেখি একপাল হরিণ মানস সরোবরের জল খাচ্ছে ৷ আমাদের দেখে দৌড়ে পালাল ৷

কিছুটা এগিয়ে আমরা গাড়ি থেকে নামি, স্নান করার জন্যে ৷ প্রণাম করে সরোবরের জলে এগোতে থাকি ৷ বরফ গোলা জল, কনকনে ঠান্ডা ৷ মনে মনে ‘ওম ব্রহ্মনে নমঃ, ওম শিবায় নমঃ, ওম চন্ডিকায়ে নমঃ’ জপে চলেছি ভগবান ব্রহ্মা, শিব আর পার্বতীর উদ্দেশ্য ৷ তিন ডুব দিয়ে শরীর অসাড় ৷ পাড়ে এসে তাড়াতাড়ি জামাকাপড় পড়ি ৷ তারপর নিজেরাই পূজো করলাম ৷ ওদিকে ব্রহ্মচারীজী তর্পন সারলেন ৷

মানস সরোবর পরিক্রমা করার সময় গুরুলা মান্ধাতা পর্বত সবচেয়ে কাছের থেকে দেখা যায় ৷ পর্বত শিখর বরফে ঢাকা ৷ একটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পাই আরো একটি হ্রদ, নাম রাক্ষস তাল ৷ গঙ্গা চু (চু মানে নদী) মানস সরোবরকে রাক্ষস তালের সাথে যুক্ত করেছে ৷ রাক্ষস তাল মানস সরোবরের পশ্চিম দিকে ৷ পরিক্রমা শেষ হয় অতিথিশালায় ফিরে ৷ পদ্ম ফুলের অনেক গল্প শুনেছিলাম, কিন্তু সরোবরে একটা পদ্ম গাছও দেখলাম না ৷ দুপুরে হালকা তুষারপাত শুরু হল ৷ সরোবরের ধারে তুষারপাতের দৃ্শ্য সত্যিই নয়নাভিরাম ৷ আমার পেটের অবস্থা ভাল না থাকায় বাকি দিন পুরোটাই বিশ্রাম নিলাম ৷

পরের দিন অর্থাৎ ৪ই জুন ৷ কৈলাস পরিক্রমার প্রথম দিন ৷ এক বাঙালী পরিবার অসুস্থতার জন্যে নিজেদের খরচায় মানস সরোবর থেকে ঝাঙ মু চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৷ আর আমরা রওনা দিলাম দারচেনের উদ্দেশ্যে ৷ দারচেন কৈলাসের দক্ষিণে ৷ ছোট শহর হলেও এখানে অনেক সুবিধা আছে ৷ পাওয়া যায় অক্সিজেন সিলিন্ডার আর বিভিন্ন জীবনদায়ী ওষুধ ৷ যারা কৈলাস পরিক্রমাতে যাবে, তারা লাইন দিয়ে একে একে বাড়িতে টেলিফোন করে নিল ৷ আমিও নিলাম, শুধু বাবার সাথেই কথা হল ৷

দারচেন থেকে জমদুয়ার যাবে সকলেই, কিন্তু কৈলাস পরিক্রমাতে যাবো বলে মনস্থির করেছি আমরা ৩০ জন যাত্রী ৷ ৬ জন শেরপাও থাকবে আমাদের সাথে ৷ যারা জমদুয়ার থেকে দারচেন ফিরে যাবে, তারা দু’রাত দারচেনেই থাকবে ৷ তাই তারা অষ্টপদ যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে ৷ জৈন মতে, তীর্থঙ্কর রুশভদেব অষ্টপদে নির্বান লাভ করেছিলেন ৷ অষ্টপদ থেকে কৈলাসের দক্ষিণ দিকের সর্বোত্তম রুপ দেখা যায় ৷ মনে হয় যেন বেশ কতগুলি সিঁড়ি আছে কৈলাস পর্বতের গায়ে ৷ কৈলাসের উত্তর দিকের রুপও মুগ্ধ করে সবাইকে ৷ সেটা ভাল দেখা যায় ডিরাফুক থেকে ৷ প্রথম দিনের কৈলাস পরিক্রমার গন্তব্যস্থল এই ডিরাফুক ৷

বাসে করে আমরা ৪০ মিনিটে ১০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে দারচেন থেকে জমদুয়ার পৌছালাম ৷ কৈলাস পরিক্রমার শুরু এখান থেকেই ৷ বলা বাহুল্য যে, হিন্দু ও বৌদ্ধরা ঘড়ির কাঁটার দিকে আর জৈন ও বনপোরা ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিক থেকে কৈলাস পরিক্রমা করে ৷ এই চার ধর্মেরই সবচেয়ে কঠিনতম ও গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ কৈলাস ৷ তিব্বতীরা কৈলাসকে বলে গাঙ্গস রিনপোচে (গাঙ্গস মানে হৈম শিখর আর রিনপোচে মানে মহামূল্যবান) ৷ এই পর্বতের উচ্চতা ২১৭৭৮ ফুট ৷ হিন্দু পুরান অনুযায়ী, কৈলাস হলো শিবলোক বা স্বর্গলোক ৷ অনেকে মেরু পর্বতও বলে, যা বিশ্বের কেন্দ্রস্থল ৷ দেখলাম জমদুয়ারের পিছন দিকে বিভিন্ন রঙের কাপড়ের প্রচুর শিকল লাগানো রয়েছে ৷ গতকাল তিব্বতীদের সবচেয়ে বড় উৎসব সাগা দাবা ছিল ৷ জমদুয়ার একবার পরিক্রমা করে, ব্রহ্মচারীজীর আনা ধুতি আমরা সবাই দান করি ৷ তারপরই কৈলাস পরিক্রমা শুরু ৷

১ কিলোমিটার দূরে সেরশাং ৷ সেখানেই পাওয়া যায় পরিক্রমা করার ঘোড়া আর পোর্টার ৷ আমরা পোর্টার নিয়েছি, নিইনি ঘোড়া ৷ শেরপারা দু’দিনের খাবার, গ্যাস সিলিন্ডার ইয়াকের পিঠে চাপিয়ে দিল ৷ ১২ কিলোমিটার রাস্তা ৷ ডানদিকে কৈলাস সহ বেশ কয়েকটি পর্বত, বাঁদিকে লা চু ৷ নদীতে অর্ধেক জল আর অর্ধেক বরফ ৷

চড়াই উতরাই পথে হেঁটে চলেছি ৷ হঠাৎ বেজে উঠলো মোবাইলটা ৷ বাড়ি থেকে মা ও দাদার ফোন ৷ যে কৈলাস মানস সরোবর আজ থেকে কিছু বছর আগেও ছিল খুবই দুর্গম, এখন সেখানে সিএমসিসির মোবাইল পরিসেবা ৷ তিব্বতীরা রীতিমতো মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে ৷ মায়ের সাথে কথা বলা প্রায় শেষ ৷ শুরু হল দু’এক ফোঁটা বৃষ্টি, তারপরই হালকা তুষারপাত ৷ ২০০ মিটার দূরে একটা তাঁবু থাকাতে রক্ষা ৷ সেখানে পৌছে একটু জল খাবার খেলাম ৷ শরীর ঠিক রাখার জন্যে জল বারে বারে খেতে হচ্ছে ৷ তুষারপাত বন্ধ হয়ে যায় ১০ মিনিট পরেই ৷ বাকি ৪ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে পৌছে গেলাম ডিরাফুক ৷

ডিরাফুক থেকে কৈলাস

ডিরাফুক থেকে কৈলাস

ডিরাফুক থেকে কৈলাসের উত্তর দিকের প্রশান্তি রুপ দেখে মন আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গেল ৷ দু’টি পর্বতের মাঝে কৈলাস বিরাজমান ৷ সবচয়ে অবাক লাগল যে, পাশের দু’টি পর্বত শিখরেও এক ফোঁটা বরফ নেই, অথচ পুরো কৈলাস পর্বত বরফে ঢাকা ৷ প্রত্যেকেই কৈলাসের ছবি তুললাম ৷ অতিথিশালায় রাত কাটাবো ৷ অতিথিশালা অবশ্য নামেই ৷ জল খাবার, টয়লেট, এমনকি আলো পর্যন্ত নেই ৷ আমরা কেউ অবশ্য আশাও করিনি ৷

কৈলাস পরিক্রমার দ্বিতীয় দিন ৷ এই যাত্রার সবচেয়ে কঠিনতম দিন ৷ ২২ কিলোমিটার রাস্তা, গড় উচ্চতা ১৬৫০০ ফুট ৷ বাতাসে অক্সিজেন খুব কমে যায় ডোলমা লা পাসে ৷ ১৮৪০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই পাস প্রায় বন্ধ থাকে তুষারপাত হলে বা অত্যাধিক বরফ পড়ে থাকলে ৷ দুপুর ১২-১টার মধ্যে ডোলমা পাস অতিক্রম করতে হয় বলে, সকাল ৬টাতেই সবাই পরিক্রমা শুরুর জন্যে প্রস্তুত ৷ শেখর আর কয়েকজন যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৷ আসলে শেখরের ঠান্ডা লেগে বুকে কফ জমে যাওয়াতে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ৷ শেখররা দারচেন ফেরত গেল, আর আমরা জুলথুলফুকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম ৷ দু’জন সহযাত্রী না আসাতে আমি ও ব্রহ্মচারীজী ঘোড়াও পেয়ে গেলাম, কিছুটা পথ যাবার জন্যে ৷ আমরা তাদের অবশ্য কিছু ইউয়ান দিয়ে দেব ৷

ঘন্টা দু’য়েক চলার পরে কৈলাসের পূর্বদিকের রুপ দেখতে পেলাম ৷ আরও তিন ঘন্টা পরে পৌছালাম ডোলমা লা পাসে ৷ অর্ধেকটা ওঠা আর পুরো নামাটা হেঁটেই করলাম ৷ পাসে অনেকেরই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ৷ তিব্বতীদের দেবী ডোলমা, কৈলাস পরিক্রমার এই পথের সৃষ্টিকর্তা এবং অধিষ্ঠাত্রী বলে, পাসের নামকরন দেবীর নামেই ৷ অনেকেই মাথার চুল ও দাঁত দেবীর উদ্দেশ্যে পাসে দান করেছে ৷ চারিদিকে প্রচুর বরফ ৷ রঙিন কাপড়ের শিকল পাসের সৌন্দর্য্য অতুলনীয় করে তুলেছে ৷ পোর্টার তাড়া দেয় পাসের থেকে নেমে যাবার জন্যে ৷

ডোলমা লা পাস

ডোলমা লা পাস

৪ কিলোমিটার চড়াই এর পরে এখন প্রায় ততটা রাস্তাই উতরাই ৷ পাসের থেকে নামতে শুরু করার পর পরই দেখতে পেলাম গৌরী কুন্ড ৷ খুব সামান্য জল, বাকি পুরোটা বরফ ৷ শুনেছি, বরফ গলে গেলে কুন্ডটি সবুজ রঙের দেখতে লাগে ৷ পুরান মতে, মাতা পার্বতী এখানেই স্নান করেন ৷ খুব বেশি পরিমানে বরফ জমে থাকাতে, কোনো যাত্রী নীচে নেমে, কুন্ডোর কাছে যেতে সাহস করতে পারল না ৷ শেরপারা গিয়ে আমাদের জন্যে জল নিয়ে এল ৷

গৌরী কুন্ড

গৌরী কুন্ড

উতরাই এর সঙ্কীর্ণ পিচ্ছিল বরফের পথে খুব সাবধানে সবাই ধীরে ধীরে নীচে নামলাম ৷ পাহাড়ের পর বরফের উপত্যকা শেষ হয় ফেদির একটু আগে ৷ ফেদিতে বিশ্রাম নেওয়ার তাঁবু আছে ৷ পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জং চু ৷ হালকা মধ্যাহ্নভোজন করে এই জং চুর পথ ধরে আমরা এগিয়ে যেতে থাকি ৷ ৪ ঘন্টা পরে জুলথুলফুকে পৌছালাম ৷ তাঁবুতে রাত্রিবাস ৷ কাছেই জুলথুলফুক গোম্ফা ৷

কৈলাস পরিক্রমার তৃতীয় দিন ৷ সহজ ১০ কিলোমিটার রাস্তা ৷ প্রায় সর্বক্ষণের সাথী এই জং চু ৷ পায়ে হেঁটে ২ ঘন্টার মধ্যে পৌছে গেলাম দারচাং মারকা ৷ এখানেই কৈলাস পরিক্রমা শেষ ৷ সবার পরিক্রমা শেষ হলে, এক সাথে ভগবান শিব ও পার্বতীর উদ্দেশ্যে ছোটো পূজা করা হল, কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্যে ৷ কেননা সকলে সুস্থ শরীরে পরিক্রমা করেছে আর আবহাওয়া ভাল ছিল বলে আমাদের বিশেষ কোনো কষ্ট হয়নি ৷ দারচাং মারকা দারচেনের ৭ কিলোমিটার পূর্বদিকে ৷ ৩৬০ ডিগ্রী পরিক্রমা তখনই শেষ হল, যখন আমরা আবার সেই দারচেনে এলাম ৷ তিব্বতী গাইড আমাদের নিয়ে এলেন ৷

দারচেনে এসে শুনলাম, ইতিমধ্যে আরও চারজন অসুস্থতার কারণে দারচেন থেকে ঝাঙ মু চলে গেছে ৷ যারা পরিক্রমাতে যায়নি সেই বাকি যাত্রীদের নিয়ে বাড়ি ফেরার পালা শুরু ৷ স্বর্গলোক ছেড়ে আসতে মন খারাপ লাগে ৷ হরচুতে এসে শেষবারের মতো মানস সরোবর দেখতে পেলাম ৷ দর্শন পেলাম কৈলাস আর গুরুলা মান্ধাতা পর্বতেরও ৷ ডোঙবা, নায়ালাম, ঝাঙ মু হয়ে ফেরত এলাম কাঠমান্ডুতে ৷ পশুপতিনাথ, বুদ্ধনাথ প্রভৃতি দেখে বিমানে দিল্লী হয়ে নাগপুরে এসে পৌছাই ৷ সাথে নিয়ে এসেছি মানসের জল, মাটি আর কতগুলি পাথর ৷

কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা নিয়ে মনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রশ্ন এসেছে ৷ বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তরও পেয়েছিলাম ৷ নিয়েছিলাম সুধাংশু স্যারের পরামর্শ ৷ স্যারেরা ২০১০ সালে এই যাত্রা করে এসেছেন ৷ নিয়েছিলাম ডাক্তারের পরামর্শও ৷ অনেক পরিকল্পনা সত্বেও যাত্রার আগে মনে ছিল অনেক সংশয় ৷ আর সব সংশয়ের সমাধান পেলাম এই যাত্রায় ৷ এই যাত্রা মনে এতটাই দাগ কেটে দিয়েছে যে এখন শুধু মনে হয় আর একবার যাই স্বর্গলোকে ৷

Advertisements

3 thoughts on “কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা

  1. Vison sundor apnar lekha ta :)…Tar thekeo prasan-sha-nio apanar Sahash & Moner ichha :)…Khub bhalo thakben, aaro ghurben & ei rokom likhe jaben!!
    ~arijit

  2. দারুন লিখেছেন । বর্ননা ও খুব ভাল এবং পরিছন্ন।
    যদিও আমি কখনও যেতে পারবো না, তার দুটো কারন। প্রথমত, আমার আর্থিক সঙ্গতি নেই। দ্বিতীয়ত, আমি এ্যাজমা পেসেন্ট(COPD). তবু মনের মাঝে অনেক ইচ্ছা লুকিয়ে থাকে ।
    ভাল বর্ননা দিয়েছেন। ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s